Cart
No products in the cart.

শীতে ঠোঁট ফাটা এমন একটা সমস্যা, যা প্রায় সবারই জীবনে কোনো না কোনো বছর এসেছে। ঠোঁট ফাটলে আমরা প্রথমেই ছুটি দোকানে, আর তখন প্রশ্নটা সামনে আসে: লিপ বাম নাকি লিপ ক্রিম? দুটোই ঠোঁট নরম রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়, অথচ কোনটা কখন কাজে লাগবে, তা না জানলে ঠোঁটের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
এই লেখায় এক অফিস-ভ্রমণের গল্পের হাত ধরে আমরা শীতে ঠোঁট ফাটার কারণ থেকে শুরু করে লিপ বাম আর লিপ ক্রিমের পার্থক্য পর্যন্ত সবকিছু সহজ ভাষায় বুঝে নেব।
এক নজরে দেখে নিন যা আছে এই লেখায়-
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অফিসের বার্ষিক ভ্রমণ পড়ল শ্রীমঙ্গলে। ভোরের কুয়াশা তখনো চা-বাগানের মাথায় ঝুলে আছে, আর দলের সবাই গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সেই দৃশ্যের ছবি তুলছে। রুমানা আর সাইফও ছিল সেই দলে। কিন্তু দুজনের মনে ছবির চেয়ে বড় একটা চিন্তা ঘুরছিল, আর সেটা ছিল নিজেদের ঠোঁট নিয়ে।
রুমানার ঠোঁটে সাদা সাদা চটা উঠছিল, আর হাসতে গেলেই ঠোঁটের কোণে জ্বালা করছিল। লিপস্টিক লাগাতে গেলে রং ফাটলের ভাঁজে জমে একটা বিশ্রী দাগ ফেলত। সাইফের সমস্যা আরও বেশি। তার নিচের ঠোঁটের মাঝখানে একটা ফাটল এমনভাবে বসে গিয়েছিল যে চা খেতে গেলেই চিনচিন করে ব্যথা করত, আর সকালে হাসতে গিয়ে একবার রক্তও বেরিয়েছিল।
“আমি তো সারাদিন লিপ বাম লাগাই,” রুমানা বিরক্ত গলায় বলল। “পকেটে সবসময় একটা থাকে। দিনে দশবার লাগাই, তবু কিছুতেই কাজ হয় না।”
“আমি তো কিছুই লাগাই না,” সাইফ ঠোঁট চেটে নিয়ে বলল। “মাঝে মাঝে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিই, তাতে একটু আরাম লাগে।” তারপর হাত তুলে ঠোঁটের একটা চটা ছিঁড়ে ফেলল।
ঠিক তখনই দলের সবচেয়ে সিনিয়র সহকর্মী তনিমা আপা পেছন থেকে বলে উঠলেন, “দুজনেই থামো। একজন বেশি লাগাচ্ছ, আরেকজন ভুলভাবে সামলাচ্ছ। দুটোই ঠোঁটের জন্য খারাপ।”
তনিমা আপা অফিসে ঢোকার আগে বছর কয়েক একটা প্রসাধনী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্লাস নিয়েছেন। ত্বক আর প্রসাধনী নিয়ে তাঁর জ্ঞানের কথা অফিসের সবাই জানে।
ঠোঁটই কেন সবার আগে ফাটে?
চায়ের কাপ নামিয়ে তনিমা আপা বসলেন বাগানের বেঞ্চিতে। রুমানা আর সাইফ তাঁর দুপাশে।
“সবার আগে বোঝো, ঠোঁটের ত্বক শরীরের বাকি ত্বকের মতো না,” তিনি শুরু করলেন। “ঠোঁটের চামড়া অনেক পাতলা, আর এখানে তেল তৈরির গ্রন্থি প্রায় নেই বললেই চলে। মুখ বা হাতের ত্বক নিজের তেলে কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। ঠোঁটের সেই সুরক্ষা নেই। তাই শুকনো আবহাওয়ায় ঠোঁট সবচেয়ে আগে ধরা খায়।”
শীতে ঠোঁট ফাটার পেছনে যেসব কারণ কাজ করে, তিনি এক এক করে বললেন:
“আর সাইফ,” তনিমা আপা ভুরু তুলে তাকালেন, “ঠোঁটের চটা ছেঁড়া সবচেয়ে বড় ভুল। এতে নিচের কাঁচা ত্বক বেরিয়ে আসে, রক্ত পড়ে, আর ঠোঁট সারতে আরও দেরি হয়।”
সাইফ লজ্জায় চুপ করে রইল।
“এবার আসল প্রশ্নে আসি,” বলে তনিমা আপা রুমানার হাত থেকে লিপ বামের স্টিকটা নিলেন। “এটা কী জিনিস, জানো?”
“ঠোঁট নরম রাখার জিনিস?” রুমানা সংশয়ে বলল।
“আংশিক ঠিক,” তিনি হাসলেন। “লিপ বাম সাধারণত মোম আর তেল-জাতীয় উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। মধুমোম, পেট্রোলিয়াম জেলি বা শিয়া বাটারের মতো উপাদান থাকে এতে। এর মূল কাজ হলো ঠোঁটের ওপর একটা পাতলা সুরক্ষা-স্তর তৈরি করা, যাতে ঠোঁটের ভেতরের আর্দ্রতা বাইরে উবে না যায় আর শুকনো হাওয়া কম ক্ষতি করে।”
লিপ বামের সুবিধাগুলো তিনি একে একে বললেন:
দিনের বেলার জন্য একটা লিপ বাম খুঁজলে Vaseline Lip Therapy দেখতে পারেন। এটি বিভিন্ন ভেরিয়েন্টে পাওয়া যায়, তাই নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পারবেন।
“তাহলে আমার তো কাজ করার কথা,” রুমানা বলল। “দিনে দশবার লাগাই!”
“সমস্যাটা এখানেই,” তনিমা আপা বললেন। “তোমার ঠোঁট এতটাই শুষ্ক যে শুধু বাম যথেষ্ট নয়। বাম আর্দ্রতা আটকে রাখে, কিন্তু ঠোঁটে যদি আগে থেকেই আর্দ্রতা কম থাকে, তাহলে আটকানোর মতো কিছু থাকে না। তখন ঠোঁটের গভীর পরিচর্যার জন্য আরেকটু ঘন কিছু দরকার হয়।”
তনিমা আপা এবার ব্যাগ থেকে একটা ছোট টিউব বের করলেন। “এটা লিপ ক্রিম। কেউ কেউ একে লিপ ট্রিটমেন্ট বা লিপ মাস্কও বলে।”
নামগুলো নিয়ে একটা কথা তিনি স্পষ্ট করে দিলেন। “বাজারে এই নামগুলোর কোনো কড়া সংজ্ঞা নেই। কোম্পানিভেদে একই জিনিসকে নানা নামে ডাকা হয়। তাই নামের চেয়ে বেশি দেখতে হবে ভেতরের টেক্সচার আর কাজ।”
সাধারণভাবে লিপ ক্রিমের বৈশিষ্ট্য এমন:
সাইফ জানতে চাইল, “তাহলে ঠিক কোনটা বেছে নেব, আপা?”
তনিমা আপা মুচকি হাসলেন। “এখানেই গল্পের আসল অংশ। উত্তরটা সবার এক নয়। চলো, আগে ঠোঁটের ভেতরের উপাদান আর কার জন্য কোনটা, সেটা দেখি।”
চায়ের বিরতির পর তনিমা আপা সবার ঠোঁটের পণ্য নিয়ে বসলেন। রুমানার বাম হাতে নিয়ে বললেন, “প্যাকেটের পেছনের উপাদানের তালিকাটা পড়তে শেখো। এটাই আসল পরিচয়।”
যেসব উপাদান ঠোঁটের জন্য সাধারণত উপকারী:
যেগুলো সম্পর্কে একটু সতর্ক থাকা ভালো:
“আর একটা কথা,” তনিমা আপা যোগ করলেন, “কোনো পণ্য লাগানোর পর ঠোঁটে জ্বালা, ফোলা বা চুলকানি হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করে দাও।”
রুমানা আর সাইফ তখন নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারছে। তনিমা আপা একটা সহজ তালিকা করে দিলেন।
রুমানা হেসে বলল, “তার মানে আমার বাম ঠিকই আছে, আমি শুধু ক্রিম বাদ দিয়ে চলছিলাম।”
“আর সাইফের পুরো ব্যবস্থাটাই নতুন করে সাজাতে হবে,” আপা হাসলেন।
আপা এক টুকরো কাগজে তিনটা ধাপ লিখে সাইফের হাতে দিলেন:
ঠোঁটে চটা উঠলে কী করবেন, সেটাও আপা বুঝিয়ে দিলেন। “টেনে ছেঁড়া চলবে না। বরং রাতে মোটা করে ক্রিম লাগাও, সকালে নরম, ভেজা কাপড়ে আলতো করে মুছে নাও। চটা আপনাআপনি সরে যাবে। আর ঠোঁট একেবারে ফেটে না থাকলে সপ্তাহে একবার খুব হালকা হাতে ঘষা যেতে পারে।”
সাইফ জানতে চাইল, “শুধু পণ্য বদলালেই কি হবে?”
“না,” আপা বললেন। “কিছু অভ্যাসও বদলাতে হবে।”
সাইফের মতো অনেক পুরুষ ভাবেন, লিপ বাম মানে মেয়েদের জিনিস। অথচ ঠোঁটের ত্বকের চাহিদা নারী-পুরুষে একই। শীতে ঠোঁট ফাটলে ব্যথা, জ্বালা আর খাওয়ার কষ্ট সবারই হয়।
শ্রীমঙ্গল থেকে ফেরার পথে বাসের জানালার ধারে বসে রুমানা আয়নায় নিজের ঠোঁট দেখছিল। চটাগুলো কমে এসেছে, কোণের জ্বালাও আর নেই। পাশের সিট থেকে সাইফ পকেট থেকে সাদা একটা স্টিক বের করে হেসে বলল, “এবার আমি সঙ্গে রাখি।”
তনিমা আপা সামনের সিট থেকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, “ঠোঁট ফাটা মানে ঠোঁট তোমাকে কিছু বলছে। শুধু শুনতে জানতে হয়।”
শীতে ঠোঁট ফাটলে লিপ বাম নাকি লিপ ক্রিম, এই প্রশ্নের কোনো একটা উত্তর নেই। আপনার ঠোঁট কতটা শুষ্ক, দিনের কোন সময়, আর আপনি কী অভ্যাসে চলছেন, এগুলোই ঠিক করে কোনটা কাজে আসবে। সাধারণভাবে দিনে বাম আর রাতে ক্রিম, এই দুই ধাপই বেশিরভাগ মানুষের জন্য ভালো শুরু।
আপনার শীতের ঠোঁটের গল্পটা কেমন, আর কোন পদ্ধতিটা আপনার জন্য কাজ করেছে? নিচে কমেন্টে আমাদের জানান।

আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অধ্যায়নরত। হৈচৈ বাংলা ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে শখের বশে লিখি; যদিও টেকনোলোজি আমার পড়াশুনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তবু যে কোন বিষয়েই লিখতে ভাল লাগে।
