Cart
No products in the cart.

গ্লুটেন-ফ্রি ওটস আর গ্লুটেন আছে এমন ওটস্ নিয়ে গল্পে গল্পে লেখা একটি শিক্ষণীয় পোস্ট।
এক নজরে দেখে নিন যা আছে এই লেখায়-
রবিবার সকালে নাশতার টেবিলে বসে রাফি ঠিক করল, এবার থেকে সে রোজ সকালে ওটস খাবে। ওজন নিয়ে ডাক্তারের কড়া কথা শুনে এসেছে। পাড়ার দোকান থেকে কেনা এক ব্র্যান্ডের ওটস আগে থেকেই তাকে পড়ে ছিল। আগের দিন সে কোসেক মার্ট থেকে অনলাইনে আনিয়েছে আরেকটা, I Am Organic Regular Rolled Oats 500g – Gluten Free।
দুটো প্যাকেট পাশাপাশি রাখতেই সে থমকে গেল। নতুনটার গায়ে বড় করে লেখা-‘Gluten Free’। পুরোনোটার পেছনে উপাদানের তালিকায় মোটা হরফে লেখা-‘Contains Gluten’।
“ওটস তো ওটসই,” সে নিজের মনে বলল। “একটাতে গ্লুটেন নেই, আরেকটায় আছে-এ আবার কেমন কথা? দুটোর একটা কি মিথ্যে বলছে?”
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সে প্যাকেট দুটোর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল তার খালাতো বোন সিঁথিকে। সঙ্গে লিখল, “আপা, এই দুই প্যাকেটের মধ্যে কোনটা ঠিক?”
মিনিট দুয়েকের মধ্যেই উত্তর এল। “দুটোই ঠিক হতে পারে। চা খেতে আয়। তোর প্রশ্নটা ভালো, আমি অনেক বছর ধরে এর উত্তর জানি।”
রাফি অবাক হলো। দুটো পরস্পরবিরোধী কথা একসঙ্গে ঠিক হয় কীভাবে?
সিঁথি আপার বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে রাফি। প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করল- “আগে বলো, গ্লুটেন জিনিসটা কী? নামটা শুনলেই কেমন ক্ষতিকর ক্ষতিকর মনে হয়।”
সিঁথি আপা হাসল। “প্রথমেই ভুলটা শুধরে দিই। গ্লুটেন কোনো বিষ নয়, কৃত্রিম রাসায়নিকও নয়। এটা একটা প্রোটিন, আরও ঠিকভাবে বললে কয়েকটি প্রোটিনের একটি দল। গম, যব (বার্লি) আর রাই নামের শস্যের দানায় এটা প্রাকৃতিকভাবেই থাকে।”
“রুটির আটা মাখতে গিয়ে হাতে কেমন টান লাগে, খেয়াল করেছিস কখনও? আটায় পানি পড়লে গমের প্রোটিনগুলো একে অপরের সঙ্গে জুড়ে সুতোর মতো জাল তৈরি করে। যত ডলাই-মলাই, জাল তত শক্ত। এই জালই আটাকে দেয় টান, নমনীয়তা আর স্থিতিস্থাপকতা। পাউরুটি যে ফোলে, তার কারণও এটা। খামিরের ইস্ট গ্যাস তৈরি করে, আর ওই জাল গ্যাসটাকে বেলুনের মতো আটকে রাখে। লাতিন ভাষায় ‘গ্লুটেন’ শব্দের অর্থ আঠা। নামটা সেখান থেকেই।”
“বুঝলাম,” রাফি বলল। “কিন্তু ওটস তো গম, যব আর রাইয়ের তালিকায় নেই। তাহলে ওটসের প্যাকেটে গ্লুটেনের কথা আসছে কেন?”
“এইবার আসল জায়গায় এলি,” সিঁথি আপা চায়ে চুমুক দিল। “উত্তরটা তিন ভাগে। আগে ওটসকে একটু ভালো করে চিনে নে।”
“ওটস আলাদা একটা শস্য,” সিঁথি আপা শুরু করল। “এতে গমের গ্লুটেন নেই। তবে ওটসের নিজস্ব একটা প্রোটিন আছে, নাম অ্যাভেনিন। গঠনে সেটা গ্লুটেনের প্রোটিনের কিছুটা কাছের আত্মীয়।”
“তাহলে তো ওটসও বিপজ্জনক?”
“না, এখানেই সূক্ষ্ম ব্যাপার। বিভিন্ন গবেষণা আর সিলিয়াক সংগঠনের পরামর্শ অনুযায়ী, সিলিয়াক রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ খাঁটি, দূষণমুক্ত ওটস নিরাপদে খেতে পারেন। কিন্তু অল্প কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের শরীর অ্যাভেনিনকেও সন্দেহের চোখে দেখে। তাঁদের জন্য খাঁটি ওটসও সমস্যা করতে পারে। কার শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, আগে থেকে বলার উপায় নেই। তাই ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলে তবেই ওটস খাওয়া শুরু করা ভালো।”
“তাহলে ‘গ্লুটেন আছে’ লেখা কি এই অ্যাভেনিনের জন্য?”
“আংশিক। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণগুলো অন্য।”
সিঁথি আপা আঙুলে গুনে গুনে বলতে লাগল।
“প্রথম কারণ আইনি লেবেলিং। ইউরোপ, ব্রিটেন আর আরও কিছু দেশের খাদ্য-অ্যালার্জেন নিয়মে ‘গ্লুটেনযুক্ত শস্য’র তালিকায় গম, রাই, বার্লির সঙ্গে ওটসও ধরা হয়। কারণ ওটস নিরাপদ কি না, তা নির্ভর করে কীভাবে ওটস চাষ ও প্রক্রিয়া হয়েছে তার ওপর, আর ক্রেতার পক্ষে সেটা বোঝা কঠিন। তাই ওই সব বাজারের জন্য বানানো প্যাকেটে ওটসের নাম মোটা হরফে ছাপা থাকে, কখনও পাশে ‘contains gluten’ বলে। এটা সতর্কবার্তা, মানে ‘সাবধান, যাঁদের গ্লুটেন-সংবেদনশীলতা আছে, তাঁরা নিজে যাচাই করে নিন’।”
“দ্বিতীয় কারণ ক্রস-কন্টামিনেশন, মানে গ্লুটেন মিশে যাওয়া। ওটস প্রায়ই গম বা যবের ক্ষেতের পাশে চাষ হয়। একই কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ফসল কাটা হয়, একই ট্রাকে পরিবহন হয়, একই কারখানায় বা একই মেশিনে প্রক্রিয়া হয়। তাতে গমের দু-চারটা দানা বা গুঁড়ো ওটসে মিশে যেতে পারে। একসময় বাজারের ওটস-জাতীয় বহু পণ্যে এমন গ্লুটেন পাওয়া গিয়েছিল, যা সিলিয়াক রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণে যে প্যাকেটে লেখা থাকে ‘may contain gluten’ বা ‘processed in a facility that handles wheat’, সেটা ফেলনা কথা নয়।”
“তৃতীয় কারণ আরও সোজা। প্যাকেটে শুধু ওটস নেই, অন্য কিছুও আছে। ফ্লেভার্ড ইনস্ট্যান্ট ওটস, মুসলি, গ্রানোলা বা রেডি মিক্সে অনেক সময় গমের আটা, বার্লি মল্ট বা গমের ফ্লেক্স মেশানো থাকে। সেখানে ‘contains gluten’ লেখা একদম খাঁটি সত্যি।”
“মানে,” রাফি বলল, “সব ‘গ্লুটেন আছে’ লেখা এক জিনিস নয়। কোনোটা আইনি সতর্কতা, কোনোটা দূষণের ঝুঁকি, কোনোটা আসলেই গম মেশানো।”
“ঠিক ধরেছিস।”
“তাহলে নতুন প্যাকেটটা?” রাফি তার অনলাইনে আনানো প্যাকেটের দিকে আঙুল দেখাল।
“ওই লেখা মানে প্রস্তুতকারক একটা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অনেক দেশে নিয়ম হলো, খাবারে প্রতি কিলোগ্রামে ২০ মিলিগ্রামের কম গ্লুটেন থাকলে (একে বলে ২০ পিপিএম) সেটাকে ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ বলা যায়। একদম শূন্য নিশ্চিত করা কার্যত কঠিন। আর এই মাত্রার নিচে বেশিরভাগ সিলিয়াক রোগীর ক্ষতি হয় না বলে ধরা হয়। তবে দেশে দেশে নিয়ম আলাদা। তাই লেবেলের পাশাপাশি প্রস্তুতকারক কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটাও দেখে নিতে হয়।”
“কঠোর নিয়মে। কোনো কোম্পানি আলাদা ক্ষেতে ওটস চাষ করে, যেখানে গম-যব নেই। আলাদা যন্ত্র আর আলাদা গুদাম ব্যবহার করে। দানা বাছাইয়ের সময় গমের দানা সরিয়ে ফেলার যন্ত্র চালায়। তারপর তৈরি পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখে, গ্লুটেন ২০ পিপিএমের নিচে আছে কি না।”
“এইসব ঝামেলার জন্যই দাম বেশি?”
“হ্যাঁ। আলাদা চাষ, আলাদা লাইন, আর বারবার পরীক্ষা, সবই খরচ। এই খরচটাই ক্রেতার ঘাড়ে পড়ে। তাই গ্লুটেন-ফ্রি ওটসের দাম সাধারণত সাধারণ ওটসের চেয়ে বেশি হয়। তুই যেটা এনেছিস, তার শিরোনামেই ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ লেখা। তবু প্যাকেটের পেছনে প্রস্তুতকারক কী লিখেছে, একবার দেখে নিস।”
রাফি এবার মাথা নাড়ল। তার প্রশ্নের প্রথম অর্ধেকের উত্তর মিলে গেছে। কিন্তু সিঁথি আপার এই অনুপুঙ্খ জ্ঞান নিয়ে আরেকটা কৌতূহল তাকে খোঁচাচ্ছিল।
“আপা, তুমি এত কিছু জানো কীভাবে?”
সিঁথি আপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কারণ আমাকে জানতেই হয়েছে।”
সিঁথি আপা শুরু করল তার কৈশোরের কথা দিয়ে। স্কুল থেকে ফিরে ভাত খাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরেই তার পেট ফুলে ঢোল হয়ে যেত। প্রায়ই পাতলা পায়খানা হতো। হাত-পায়ে জোর পেত না। সহপাঠীরা যখন লম্বা হচ্ছে, সে তখনও ছোটখাটো আর রোগা। রক্ত পরীক্ষা করলেই ধরা পড়ত রক্তশূন্যতা।
“ডাক্তার কম দেখাইনি,” সে বলল। “কেউ বলল গ্যাস্ট্রিক, কেউ বলল পেটে কৃমি, কেউ বলল পরীক্ষার টেনশন। আয়রনের ওষুধ খেতাম, কিছুদিন ভালো লাগত, আবার যে সেই। নিজেকেই মনে হতো দুর্বল মানুষ। অথচ সবাই যা খায়, আমি কেন তা হজম করতে পারি না?”
“কত বছর এভাবে গেল?”
“প্রায় দশ বছর। চব্বিশ বছর বয়সে এক নতুন ডাক্তার আমার পুরোনো কাগজপত্র দেখে বললেন, ‘তোমার একটা রক্ত পরীক্ষা করাতে চাই। সিলিয়াক ডিজিজ হতে পারে।’ পরীক্ষায় একটা বিশেষ অ্যান্টিবডির মাত্রা অনেক বেশি এল। তারপর ছোট অন্ত্রের একটা অংশের নমুনা নিয়ে বায়োপসি হলো। ফল নিশ্চিত, সিলিয়াক।”
রাফি নড়েচড়ে বসল। “সিলিয়াক ডিজিজ আসলে কী?”
“এটা অ্যালার্জি নয়, রাফি। এটা একটা অটোইমিউন রোগ। আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা পাহারাদারের মতো। জীবাণু এলে লড়াই করে। কিন্তু সিলিয়াক রোগে সেই পাহারাদার গ্লুটেনকে শত্রু ভেবে বসে। গ্লুটেন ঢুকলেই সে আক্রমণ করে, আর সেই আক্রমণের মাঝখানে পড়ে যায় ছোট অন্ত্রের ভেতরের দেয়াল।”
“ছোট অন্ত্রের ভেতরের দেয়ালে অসংখ্য আঙুলের মতো ক্ষুদ্র ভাঁজ থাকে, নাম ভিলাই। এদের কাজ খাবার থেকে পুষ্টি শুষে রক্তে পাঠানো। প্রতিদিন গ্লুটেন খেলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ওই ভিলাইগুলোকেই ক্ষয় করে দেয়। তখন তুই খেয়ে যাচ্ছিস, অথচ আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বা প্রোটিন শরীরে পৌঁছাচ্ছে না। তাই আমার রক্তশূন্যতা সারত না, হাড় দুর্বল ছিল, ওজন বাড়ত না। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ বৃদ্ধিও থামিয়ে দিতে পারে।”
“খুব বিরল রোগ?”
“বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ জনে একজনের মধ্যে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অথচ অনেকে সারা জীবন জানেই না। কারও পেট ফাঁপে, কারও ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, কারও শুধু অবসাদ, মাথাব্যথা, ত্বকে চুলকানিযুক্ত ফুসকুড়ি বা বারবার রক্তশূন্যতা। এই নানা মুখোশের কারণেই ধরা পড়তে এত দেরি হয়।”
“চিকিৎসা?”
সিঁথি আপা কাপটা নামিয়ে রাখল। “একটাই। সারা জীবন কঠোরভাবে গ্লুটেন বাদ দেওয়া। কোনো ওষুধ এখনও এর বিকল্প নয়। আর ‘কঠোরভাবে’ শব্দটাই এখানে আসল। একটু-আধটু গ্লুটেনও আমার অন্ত্রে আবার ক্ষয় শুরু করিয়ে দিতে পারে, এমনকি তখন আমি কোনো কষ্ট না-ও টের পেতে পারি।”
রাফি এবার বুঝতে পারল, দুটো প্যাকেটের তফাত তার কাছে কৌতূহলের বিষয়, আর কারও কারও কাছে নিরাপত্তার বিষয়।
রাফি নিজের কেনা প্যাকেটদুটো আবার হাতে নিল। পুরোনোটার সামনে লেখা ‘100% Natural Rolled Oats’। নতুনটার গায়ে ‘Organic’ শব্দটা বড় করে ছাপা, আর তার পাশেই আলাদা করে ‘Gluten Free’।
“এই লেখাগুলো তো সবই ভালো, তাই না? ১০০% ওটস, প্রাকৃতিক, অর্গানিক?”
“ভালো হতে পারে, কিন্তু গ্লুটেনের প্রশ্নে প্রথম তিনটা শব্দ কিছুই বলে না,” সিঁথি আপা মাথা নেড়ে বলল। “‘১০০% ওটস’ মানে প্যাকেটে ওটস ছাড়া অন্য শস্য ইচ্ছাকৃতভাবে মেশানো হয়নি। ওটসের ক্ষেতে গম মিশেছে কি না, সেই গ্যারান্টি এটা দেয় না। ‘অর্গানিক’ মানে চাষে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার হয়নি। তাতে ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি কমে না। ‘পিওর’ বা ‘ন্যাচারাল’ শব্দেরও কোনো গ্লুটেন-ম্যাজিক নেই। খেয়াল কর, তোর নতুন প্যাকেটে ‘অর্গানিক’ আর ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ দুটো আলাদা কথা আলাদা করে লেখা। একটা দিয়ে অন্যটা বোঝানো হয়নি।”
“তাহলে কোন শব্দ দেখে ভরসা করব?”
“একটাই। ‘গ্লুটেন-ফ্রি’, আর সেটার পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতকারক বা স্বীকৃত সনদ। যাঁদের সিলিয়াক আছে, তাঁদের জন্য ব্রিটেনের কোএলিয়াক সংগঠনের মতো প্রতিষ্ঠানও একই কথা বলে। শুধু ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ লেখা ওটসই তাঁদের জন্য বিবেচনার যোগ্য।”
চায়ের ফাঁকে রাফি হঠাৎ মনে করল। “আপা, আমার ছোট বোন তিশা অনলাইনে প্রসাধনী কেনে। ও জিজ্ঞেস করছিল, লিপস্টিক, শ্যাম্পু বা ফেসক্রিমে কি গ্লুটেন থাকে? ওগুলোতেও কি গ্লুটেনের ভয় আছে?”
সিঁথি আপা হাসল। “ভালো প্রশ্ন। প্রথমে ভুল ধারণাটা ভেঙে দিই। গ্লুটেনের প্রোটিন অণু আকারে বেশ বড়। অক্ষত ত্বকের ভেতর দিয়ে সেটা শরীরে ঢুকতে পারে না। সিলিয়াক রোগের প্রতিক্রিয়া শুরু হয় গ্লুটেন মুখ দিয়ে খেলে, ত্বকে লাগালে নয়। এমনকি ত্বকের যে রোগটা গ্লুটেনের সঙ্গে জড়িত, ডার্মাটাইটিস হার্পেটিফর্মিস বা ‘গ্লুটেন র্যাশ’, সেটাও খাওয়ার কারণে হয়, লাগানোর কারণে নয়। সিলিয়াক-বিশেষজ্ঞ ডা. আলেসিও ফাসানোর মতও তা-ই। তিনি বলেন, ত্বকে লাগালে সাধারণত সমস্যা নেই, তবে ত্বক কাটা-ছেঁড়া থাকলে বাড়তি সতর্কতা ভালো।”
“তাহলে শ্যাম্পু আর ক্রিম নিয়ে ভাবনা নেই?”
“মোটামুটি নেই। কিন্তু ‘মোটামুটি’ শব্দটা খেয়াল কর। কিছু রোগী লোশন বা মেকআপের পর অস্বস্তির কথা জানান। সেটা গ্লুটেনের কারণে, নাকি অন্য কোনো উপাদানের অ্যালার্জির কারণে, তা নিয়ে গবেষণা সীমিত। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো, যে প্রসাধনী মুখে চলে যেতে পারে, সেগুলো নিয়ে সতর্ক থাকা।”
সে আঙুলে গুনে বলল, “লিপস্টিক, লিপ বাম, টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ-এগুলো কিছু না কিছু পেটে যায়। খাওয়ার আগে হাতে লোশন মাখলে সেটাও কিছুটা খাবারে লেগে যেতে পারে। যাঁরা নখ কামড়ান, তাঁদের জন্যও কথাটা খাটে। পাউডার বা স্প্রে জাতীয় জিনিস নাকে-মুখে গেলেও একই সতর্কতা।”
“উপাদানের তালিকায় কী খুঁজব?”
“গমের জার্ম অয়েল, হাইড্রোলাইজড হুইট প্রোটিন, যবের নির্যাস, রাইয়ের নির্যাস, আর অনেক সময় ওটসের নির্যাসও। এগুলো প্রসাধনীর তালিকায় প্রায়ই লাতিন বৈজ্ঞানিক নামে লেখা থাকে, যেমন ‘ট্রিটিকাম ভালগেয়ার’ মানে গম, আর ‘হর্ডিয়াম ভালগেয়ার’ মানে যব। আরেকটা আলাদা ব্যাপার মনে রাখিস। হাইড্রোলাইজড হুইট প্রোটিন কারও কারও ত্বকে চুলকানি বা আমবাত বাধাতে পারে। সেটা গমের অ্যালার্জির সূত্রে হয়, সিলিয়াকের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।”
“আর ওটসের নির্যাস মেশানো ক্রিম?”
“ওটমিল বা ওটসের নির্যাস অনেক স্কিনকেয়ার পণ্যে থাকে। ত্বকে লাগানোর ক্ষেত্রে ওই একই যুক্তি খাটে। তবে সেই পণ্য ঠোঁটে বা মুখে ব্যবহারের হলে তখন ক্রস-কন্টামিনেশনের কথা ভাবতে হয়।”
রাফি নোট নিতে নিতে বলল, “তাহলে প্রসাধনীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আছে কেবল মুখে যাওয়ার সম্ভাবনায়।”
“ঠিক তাই। আর তিশাকে বলিস, লেবেলে ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ লেখা থাকলে সুবিধা, কিন্তু না থাকলেও আতঙ্কের কারণ নেই। শুধু মুখের কাছের জিনিসগুলোতে একটু বেশি নজর রাখুক।”
ঠিক তখনই রাফির ফোন বেজে উঠল। তিশা। “ভাইয়া, আমার ছেলের সাত মাস চলছে। ডাক্তার বলেছেন, ধীরে ধীরে খাবার বাড়াতে। ভাবছি বেবি ওটস দিয়ে শুরু করব। কোনটা কিনব, বুঝতে পারছি না।”
রাফি ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বলল, “দাঁড়া, দেখছি।” কোসেক মার্টের বেবি ফুডস পাতাটা খুলতেই কয়েকটা নাম চোখে পড়ল। সে এক এক করে পড়ে শোনাল। Health Paradise Organic Baby Oats 500g, Ausimex Baby Oats 500g, Vitacare Baby Oats 350g, Cowhead Baby Oats, Oateo Baby Oats, আর I Am Organic Instant Baby Oats 500g – Organic & Gluten Free।
সিঁথি আপা ঝুঁকে পড়ে বলল, “নাম আর দাম দেখে বাছিস না, তিশা। শিশুর খাবারের বেলায় সবচেয়ে বড় কথা প্যাকেটের পেছনটা পড়া। উপাদানে শুধু ওটস আছে, নাকি চিনি, দুধ বা অন্য কিছু মেশানো? গ্লুটেনের ব্যাপারে প্রস্তুতকারক কী বলছে? পরিবারে যদি কারও সিলিয়াক থাকে, তবে যে প্যাকেটে স্পষ্ট ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ লেখা, সেটা বাড়তি নিশ্চিন্ততা দেয়। আর ছেলের কোনো খাদ্য-অ্যালার্জি আছে কি না, বা পরিবারে সিলিয়াকের ইতিহাস আছে কি না, শিশুবিশেষজ্ঞকে আগে জানিয়ে নিস।”
“আর ওটস শুরুর সময়?”
“সেটা ডাক্তারের ঠিক করে দেওয়া সময় ধরে চল। বাকিটা প্যাকেট দেখে ঠিক করবি।”
তিশা “আচ্ছা আপা” বলে ফোন রাখল। রাফির মনে হলো, একটা সকাল আর দুটো প্যাকেটের প্রশ্ন থেকে কত দূর চলে এসেছে।
বিদায় নেওয়ার আগে রাফি জানতে চাইল, “যে কেউ ওটস কিনতে গেলে কী দেখবে?” সিঁথি আপা ফোনের নোটে লিখে পাঠাল চারটা প্রশ্ন।
গ্লুটেন-ফ্রি লেখা আছে কি না? যাঁদের সিলিয়াক বা গ্লুটেন-সংবেদনশীলতা আছে, তাঁরা শুধু এমন ওটসই বেছে নেবেন, যার প্রস্তুতকারক নির্ভরযোগ্য এবং লেবেলে স্পষ্ট ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ লেখা।
‘Contains gluten’, ‘may contain’ বা ‘processed in a facility that handles wheat’ লেখা আছে কি না? এগুলো আইনি সতর্কতা হতে পারে, দূষণের ঝুঁকির ইঙ্গিতও হতে পারে। হালকাভাবে নেবেন না।
উপাদানের তালিকায় ওটস ছাড়া আর কী আছে? ফ্লেভার্ড ইনস্ট্যান্ট ওটস বা মুসলিতে গমের আটা, বার্লি মল্ট বা গমের ফ্লেক্স থাকতে পারে।
‘১০০% ওটস’, ‘অর্গানিক’, ‘পিওর’ লেখা দেখে ভুলবেন না। এগুলো গ্লুটেন-মুক্ত হওয়ার প্রমাণ নয়।
নিচে সে আরেকটা লাইন জুড়ে দিল, “আর যাঁর সিলিয়াক ধরা পড়েছে, তিনি ওটস খাওয়ার আগে ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলবেন। অল্প কিছু মানুষ খাঁটি ওটসেও সাড়া দেন।”
বাড়ি ফিরে রাফি দুটো প্যাকেট আবার টেবিলে সাজাল। এবার সে প্যাকেটের পেছনটা পড়ল, একটা একটা করে শব্দ ধরে। যে প্যাকেটে ‘Contains Gluten’ লেখা, সেটায় উপাদান বলতে শুধু ওটস। অর্থাৎ ওই লেখা এসেছে আইনি সতর্কতা থেকে। তার নিজের জন্য, যার গ্লুটেনে কোনো সমস্যা নেই, ওটা দিব্যি চলবে। ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ প্যাকেটটা সে আলাদা করে সরিয়ে রাখল, পরের বার সিঁথি আপা এলে তাকে দেবে বলে।
সিঁথি আপাকে সে একটা ছোট বার্তা পাঠাল, “আপা, আজ বুঝলাম, প্যাকেটের গায়ের ছোট লেখার পেছনেও গল্প থাকে। দুটো প্যাকেটই ঠিক ছিল, শুধু ভাষা ছিল আলাদা।”
উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে। একটা হাসির ইমোজি, আর তারপর এক লাইন: “জানলে অর্ধেক ভয় কেটে যায় রে। আজ থেকে তুই প্যাকেটের পেছনটাও পড়বি।”
তাই পরের বার কোনো ওটসের প্যাকেটে ‘গ্লুটেন-ফ্রি’ বা ‘গ্লুটেন আছে’ লেখা দেখলে মনে রাখবেন, দুটোই তথ্য। একটা বলছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, অন্যটা বলছে সতর্ক হওয়ার আহ্বান। যাঁর গ্লুটেনে সমস্যা নেই, তাঁর জন্য এই লেখাগুলো কৌতূহলের খোরাক। আর সিঁথি আপার মতো মানুষের জন্য সেটাই খাবারের টেবিলে নিশ্চিন্তে বসার প্রথম শর্ত।

আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অধ্যায়নরত। হৈচৈ বাংলা ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে শখের বশে লিখি; যদিও টেকনোলোজি আমার পড়াশুনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তবু যে কোন বিষয়েই লিখতে ভাল লাগে।
