We never sell any copy / duplicate / reflica product
Hotline: 01712867627
0 ৳ 0.00

Cart

No products in the cart.

শীতে শিশুর যত্ন: ইফার প্রথম শীত আর এক মায়ের নতুন পাঠ

শীতে শিশুর যত্ন

শীতে শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে নতুন মা-বাবারা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন। ইফার মা নিরার গল্পটাও শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনই এক সন্ধ্যায়, নভেম্বরের মাঝামাঝি। টঙ্গীর দত্তপাড়ার গলিতে কুয়াশা নামতে শুরু করেছে। দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যেতে না যেতেই বাতাসটা কেমন যেন ধারালো হয়ে উঠল। জানালার পর্দা টানতে গিয়ে নিরা টের পেল, তার আঙুলের ডগা ঠান্ডা আর একটু খসখসে লাগছে।

“এ বছর শীতটা আগেভাগেই এসে গেল,” নিজেকে বলল সে।

খাটের মাঝখানে চিত হয়ে শুয়ে আছে ইফা। পাঁচ মাসের ছোট্ট মেয়েটা জীবনের প্রথম শীতের মুখোমুখি। দুই পা শূন্যে তুলে সে নিজের পশমি মোজা ধরার চেষ্টা করছে, আর মাঝে মাঝে এমন একটা শব্দ করছে, যেটাকে এ বাড়ির সবাই “কথা বলা” ধরে নেয়। নিরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু সেই হাসির নিচে একটা চাপা দুশ্চিন্তাও ছিল। গত বছর শীতে সে নিজের যত্নই ঠিকমতো নিতে পারত না। এবার কোলে একটা নরম, ছোট্ট প্রাণ, যে নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না।

ঠিক তখনই দরজায় কলিং বেলের শব্দ। অফিস থেকে ফিরেছে সাকিব, সঙ্গে ছয় বছরের তিহান। তিহানের গাল দুটো লালচে, নাকের পাশে সাদা সাদা শুকনো দাগ।

“মা, আমার গালে জ্বালা করে,” স্কুলব্যাগ নামাতে নামাতেই সে অভিযোগ জানাল।

আর তাদের পেছন পেছন ঢুকলেন নানু, মানে নিরার মা রহিমা বেগম। ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন নাতনির প্রথম শীতের তদারকি করতে। এক হাতে পুরোনো একটা টিনের কৌটা, ভেতরে সর্ষের তেল, অন্য হাতে ভাঁজ করা কয়েকটা নরম কাঁথা।

“শীতের বাচ্চাকে আমরা এভাবেই বড় করেছি,” নানু কৌটাটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন। “তেল মাখাব, কাঁথায় জড়াব, রোদে বসাব। আর দরজা-জানালা এঁটে দেব, যেন একটুও ঠান্ডা না ঢোকে।”

নিরা বুঝল, আজ রাতে এই ঘরে দুটো যুগ মুখোমুখি বসতে যাচ্ছে। একদিকে নানুর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে নিরার পড়া আর জানা নতুন তথ্য। দুজনেরই চাওয়া একটাই, ইফা যেন ভালো থাকে। প্রশ্ন শুধু একটাই, কোন কথাটা কতটা মানতে হবে।

ঘরটাই আগে ঠিক করো

নানু উঠে জানালার ছিটকিনি আটকাতে যাচ্ছিলেন। নিরা আলতো করে বলল, “মা, একটু দাঁড়াও। শীতে ঠান্ডা যেমন ক্ষতি করে, একেবারে বদ্ধ ঘরও তেমনি। ঘরে বাতাস চলাচল না থাকলে সর্দি-কাশির জীবাণু ঘুরেফিরে সেই ঘরেই থেকে যায়।”

“তাহলে কি বাচ্চাকে ঠান্ডার মধ্যে রাখব?” নানু একটু অভিমানী গলায় বললেন।

“না, মা। দিনে রোদ উঠলে জানালা একটু খুলে ঘরের বাতাস বদলে নেব। আর রাতে যেদিক দিয়ে সরাসরি ঠান্ডা হাওয়া আসে, সেদিকের ফাঁকটা পর্দা দিয়ে আটকে দেব। ঘরটা হবে আরামদায়ক, না গরম, না কনকনে। আমরা পাতলা জামায় যতটা স্বস্তিতে থাকি, ঘর ততটাই উষ্ণ হলেই চলবে।”

সাকিব ইফাকে কোলে নিয়ে মাথা নাড়ল। “আর হিটার, কয়লার চুলা কিংবা মশার কয়েলের ধোঁয়া ওই ঘরে একদম নয়। বন্ধ ঘরে ওসব শিশুর শ্বাসের জন্য ঝুঁকির।”

নানু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তাহলে কাপড়?”

এখানে এসে দুজনের মতের প্রথম মিল হলো। নানু চেয়েছিলেন মোটা কাঁথায় পেঁচিয়ে রাখতে। নিরা বলল, “একটা মোটা জামার চেয়ে পাতলা কয়েক স্তর কাপড় ভালো, মা। গরম লাগলে একটা খুলে দেওয়া যায়, ঠান্ডা লাগলে একটা বাড়ানো যায়। সবচেয়ে ভেতরের স্তরটা হবে নরম সুতির, কারণ ওটাই ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকে।”

“কিন্তু বুঝব কী করে বাচ্চার ঠান্ডা লাগছে কি না?”

“হাত-পা ছুঁয়ে নয়,” নিরা বলল। “ওগুলো এমনিতেই একটু ঠান্ডা থাকে। বুকে বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে দেখতে হয়। উষ্ণ আর শুকনো লাগলে ঠিক আছে। ঘেমে গেলে বুঝতে হবে বেশি পরানো হয়েছে। আর ঠান্ডা লাগলে একটা স্তর বাড়াতে হবে।”

বাইরে নিতে হলে মাথা আর কান ঢাকতে হবে, পায়ে মোজা আর হাতে নরম দস্তানা থাকলে ভালো। তবে ঘরের ভেতরে ঘুমের সময় টুপি না পরানোই নিরাপদ, কারণ ঘুমের মধ্যে শিশুর শরীর বেশি গরম হয়ে গেলে সেটা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নানু এবার আর তর্ক করলেন না। শুধু বললেন, “আমাদের সময়ে এসব কেউ বলেনি, কিন্তু কথাগুলো তো যুক্তির।”

গোসল নিয়ে নানুর আপত্তি

পরদিন সকালে শুরু হলো আসল লড়াই। নানুর মত, শীতে বাচ্চাকে রোজ গোসল করানো মানে ঠান্ডা লাগানোর নিমন্ত্রণ। নিরার ভাবনা অন্যরকম। গোসল পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই, দরকার শুধু সময় আর পদ্ধতি ঠিক রাখা।

“দিনের সবচেয়ে উষ্ণ সময়টা বেছে নেব, মা। ধরো, বেলা এগারোটা-বারোটা। ঘর আগে থেকে গরম রাখব, তোয়ালে হাতের কাছে রাখব, আর পানি হবে কুসুম গরম। বেশি গরম পানি শিশুর ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়, তাতে ত্বক আরও শুকিয়ে যায়।”

“আর কতক্ষণ?”

“পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি নয়। আর শীতে প্রতিদিন সাবান লাগানোরও দরকার নেই। যেদিন সাবান বা ওয়াশ ব্যবহার করব, সেদিনও একদম অল্প, মৃদু কিছু। গলার ভাঁজ, কানের পেছন আর বগলের মতো জায়গাগুলো আলতো করে ধুয়ে, নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে মুছে নেব। ঘষব না।”

নিরার মনে পড়ে গেল কয়েক দিন আগে পড়া একটা লেখার কথা, যেখানে সাবান নাকি বডি ওয়াশ নিয়ে বেশ গুছিয়ে আলোচনা ছিল। সেখান থেকেই সে বুঝেছিল, শীতে ত্বকের জন্য শুধু কী ব্যবহার করছি তা নয়, কীভাবে ব্যবহার করছি সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নানু তেলের কৌটাটা কোলে টেনে নিলেন। “তাহলে আমার সর্ষের তেল?”

নিরা হেসে বলল, “মালিশ আমাদের বাড়ির ভালোবাসার অংশ, মা। ওটা বাদ দিতে বলছি না। তবে অনেক শিশু চিকিৎসক বলেন, সর্ষের তেল কিছু শিশুর নরম ত্বকে জ্বালা বা র‍্যাশ তৈরি করতে পারে। তাই তেল বেছে নেওয়ার আগে ইফার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নেব। আর যে তেলই হোক, আগে হাতের ছোট্ট একটা জায়গায় লাগিয়ে এক দিন দেখব ত্বকে লালচে ভাব বা চুলকানি হয় কি না।”

নানু একটু ভেবে বললেন, “ঠিক আছে। ডাক্তার যা বলবে, তাই হবে। তবে মালিশটা আমিই করব।”

“তুমিই করবে, মা,” নিরা বলল। “আমার চেয়ে ভালো হাত আর কার আছে?”

গোসলের পরের তিন মিনিট

নানু যখন ইফাকে নরম তোয়ালেতে জড়িয়ে নিয়ে এলেন, নিরা তখন একটা কথা বলল, যেটা সে নিজেও কিছুদিন আগে জেনেছে। শীতে ত্বকের সবচেয়ে বড় শত্রু শুষ্কতা। আর শুষ্কতা ঠেকানোর সবচেয়ে ভালো সময় হলো গোসলের ঠিক পরেই, ত্বক যখন সামান্য ভেজা থাকে।

ইফার জন্য সে হাতে তুলে নিল জনসন’স সফট ক্রিম। শিশুর ত্বকের জন্য তৈরি এই ক্রিম সে আগেই পরখ করে নিয়েছিল। মেয়ের কানের পেছনের ছোট্ট একটা জায়গায় আগের দিন সামান্য লাগিয়ে দেখেছে, কোনো লালচে ভাব বা ফুসকুড়ি হয়নি। এরপর গাল, কনুই আর হাঁটুর পেছনের মতো শুষ্ক হয়ে ওঠা জায়গাগুলোয় পাতলা করে ক্রিম মেখে দিল। চোখের আশপাশ সে সযত্নে এড়িয়ে গেল।

“এত অল্প?” নানু অবাক হলেন।

“শিশুর ত্বকে অল্পই যথেষ্ট, মা। বেশি লাগালে কিছু আসে-যায় না, উল্টো লোমকূপ আটকে যেতে পারে। আর কোনো জায়গায় যদি লালচে ভাব, জ্বালা বা পানি ঝরা ঘা দেখি, ক্রিম লাগানোর কথা ভুলে গিয়ে সোজা ডাক্তারের কাছে যাব।”

এ সময় তিহান দৌড়ে এসে নিজের গাল দেখাল। “মা, আমার গালেরটা?”

নিরা ছেলের গালে হাত বুলিয়ে দেখল। ছয় বছরের এই ছেলের ত্বক ততটা নাজুক নয়, কিন্তু স্কুলের পথের ঠান্ডা বাতাসে ঠিকই রুক্ষ হয়ে গেছে। তার জন্য নিরা একটু আলাদা ব্যবস্থা ভাবল। ছোট্ট একটু নিভিয়া সফট ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম নিয়ে ছেলের গালে আলতো করে মেখে দিল। “রাতে ঘুমানোর আগে আর স্কুলে যাওয়ার আগে, দুবার,” বলল সে। “আর মুখ ধুয়ে নিয়ো, ঠিক আছে? শুকনো ত্বকে লাগানোর চেয়ে সামান্য ভেজা ত্বকে লাগালে বেশি ভালো কাজ করে।”

তিহান মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “নানু, তোমার হাতটা এত খসখসে কেন?”

নানু নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। “সংসার করতে করতে, বাবা। শীতে আরও বেড়ে যায়।”

সেই মুহূর্তে নিরা বুঝল, শীতের যত্ন শুধু ইফার একার নয়। পুরো পরিবারের।

সকালের রোদ আর একটু ধৈর্য

পরদিন সকালে কুয়াশা কাটতে একটু সময় নিল। সাড়ে আটটার দিকে ছাদের কোণায় সোনালি রোদ এসে পড়ল। নানু তার আগেই একটা মাদুর বিছিয়ে বসে আছেন।

“এবার তো রোদে বসানো যাবে?” তাঁর গলায় সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাস।

“যাবে, মা,” নিরা হেসে বলল। “সকালের নরম রোদ শিশুর জন্য ভালো। তবে বেশিক্ষণ নয়, দশ-পনেরো মিনিট। চোখে যেন সরাসরি রোদ না পড়ে, আর বাতাস থাকলে আড়াল করে বসাব। রোদ চড়ে যাওয়ার আগেই ঘরে ফিরব।”

নানুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “দেখেছ, আমরা সব কথা ভুল বলিনি।”

“একদম না,” নিরা বলল। “পুরোনো অভ্যাসের অনেকটাই ঠিক ছিল। আমরা শুধু ঘেঁটে দেখছি কোনটা রাখব, কোনটা একটু বদলাব।”

মাদুরে বসে ইফা রোদের দিকে মুখ তুলে খিলখিল করে হাসল। সেই হাসি দেখে সাকিব ফোন বের করে ছবি তুলল। তিহান ততক্ষণে দাদুর পুরোনো চাদর গায়ে জড়িয়ে নিজেকে “শীতের রাজা” ঘোষণা করেছে।

খাবার আর পানির হিসাব

দুপুরে রান্নাঘরে নানু আর নিরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কথা উঠল ইফার খাবার নিয়ে।

“ছয় মাস তো হয়ে এল। এবার কি ভাত-খিচুড়ি ধরাব?”

“আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিই, মা,” নিরা বলল। “ছয় মাস পূর্ণ হলে ধীরে ধীরে নতুন খাবার শুরু করা হয়। তার আগে পর্যন্ত বুকের দুধই যথেষ্ট, আলাদা পানিও লাগে না। শীতে যদিও পিপাসা কম টের পাওয়া যায়, শিশুর শরীরে পানির চাহিদা কমে না। ছয় মাসের পর অল্প অল্প ফোটানো ঠান্ডা পানি দেওয়া যায়, আর বুকের দুধ চলতেই থাকবে।”

নিরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল, প্রথম খাবার হবে পাতলা ওটস পরিজ। বাজারে নানা ব্র্যান্ড আছে, তবে সে খুঁজছিল এমন কিছু, যার উপাদানের তালিকা ছোট আর বুঝতে সহজ। হেলথ প্যারাডাইস অর্গানিক বেবি ওটস আর আই অ্যাম অর্গানিক ইনস্ট্যান্ট বেবি ওটস দুটোই সে পাশাপাশি দেখে রেখেছে। কিন্তু প্যাকেট বদলের আগে সবচেয়ে জরুরি, ইফার ডাক্তারের অনুমতি। আর যদি কখনো তৈরি খাবারের সুবিধা লাগে, তখন নেসলে সেরেলাক তো আছেই। প্রতিটি স্টেজ কোন বয়সের জন্য, সেটা প্যাকেটে দেখে নিলেই হয়।

নানু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “ডাক্তার বললে কি এক চামচ চিনি বা মধু দেওয়া যাবে? আমরা তো দিতাম।”

“না, মা। শিশুর খাবারে চিনি বা লবণ কিছুই নয়। আর মধু অন্তত এক বছর বয়স পর্যন্ত একদমই না। নতুন খাবার দেব একবারে একটা করে, দু-তিন দিন দেখে তারপর পরেরটা। তাহলে কোনটাতে অ্যালার্জি বা পেটের সমস্যা হচ্ছে, বোঝা সহজ হয়।”

নানু মাথা নেড়ে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেললেন। “আমরা কত কিছুই না জেনে করেছি।”

“তাতে কী, মা? তোমরা ভালোবেসে করেছ। আমরা শুধু একটু বেশি জানি, এই যা।”

সর্দি-কাশির এক রাত

তৃতীয় রাতটা ছিল সবচেয়ে কঠিন। মাঝরাতে নিরার ঘুম ভেঙে গেল ইফার অদ্ভুত শব্দে। মেয়ের নাক বন্ধ, প্রতিবার শ্বাসের সঙ্গে ঘড়ঘড় করছে। দুধ খেতে গিয়ে বারবার মুখ সরিয়ে নিচ্ছে।

নিরার বুক ধক করে উঠল। সাকিবকে ডেকে তুলল সে।

সাকিব চোখ কচলে উঠে বসল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ইফার দিকে তাকিয়ে থাকল। “শান্ত হও, নিরা। আগে দেখি, ও ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে কি না। ঠোঁটের রং, বুক ওঠানামা, সবকিছু।”

দুজনে মিলে ইফাকে সোজা করে কোলে ধরল। কিছুক্ষণ পর শ্বাসের শব্দ একটু কমল। ঠোঁটের রং স্বাভাবিক, বুক স্বাভাবিকভাবে উঠছে-নামছে, জ্বরও নেই। নিরা ধীরে ধীরে দুধ খাওয়াল, মাথা একটু উঁচু করে ধরে।

পরদিন সকালে শিশুবিশেষজ্ঞকে দেখানো হলো। ডাক্তার জানালেন, এটা সাধারণ ঠান্ডা। বাড়িতে যা করার, তা বুঝিয়ে দিলেন: ঘর স্বাভাবিক আর্দ্র রাখা, বারবার অল্প অল্প দুধ খাওয়ানো, নাক পরিষ্কারের জন্য ডাক্তারের বলে দেওয়া পদ্ধতি মেনে চলা। নিজে থেকে কোনো কাশির ওষুধ, নাকে ড্রপ বা মলম নয়। শিশুর বেলায় এসব নিজের মতো করে দিতে নেই।

আর কোন কোন লক্ষণ দেখলে আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিতে হবে, সেটা ডাক্তার আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন। নিরা ফোনের নোটে লিখে রাখল:

  • শ্বাস খুব দ্রুত চলা, বুক ভেতরে দেবে যাওয়া বা শ্বাসের সঙ্গে গোঙানির মতো শব্দ
  • ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া
  • জ্বর, বিশেষ করে তিন মাসের কম বয়সী শিশুর যেকোনো জ্বর
  • দুধ বা খাবার একদম না খাওয়া
  • অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে থাকা বা ডাকলেও সাড়া না দেওয়া
  • প্রস্রাব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হওয়া

“আর সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ,” ডাক্তার হেসে যোগ করলেন, “হাত ধোয়া। শিশুকে ধরার আগে সবাই হাত ধোবেন। আর যার সর্দি-কাশি আছে, তিনি দূরে থাকুন, অন্তত মাস্ক পরুন।”

বাড়ি ফিরে নিরা সবাইকে নতুন নিয়ম জানিয়ে দিল। স্কুল থেকে ফিরে তিহান আগে হাত-মুখ ধোবে, জামা বদলাবে, তারপর বোনকে ছোঁবে। তিহান ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি কি জীবাণু?” সাকিব হেসে ফেলল, “না রে, তুই আমাদের রক্ষাকর্তা। কিন্তু রক্ষাকর্তাকেও হাত ধুতে হয়।”

ঘুমের নিরাপত্তা: কম্বলের নিচের সত্যি কথা

একদিন রাতে নানু ইফাকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে মোটা একটা কাঁথা তার গলা পর্যন্ত টেনে দিতে যাচ্ছিলেন। নিরা শান্ত গলায় থামাল।

“মা, শীতের রাতে ঘুমানো নিয়ে কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে। ইফা ঘুমাবে চিত হয়ে, পিঠের ওপর। বিছানা হবে শক্ত, নরম তুলতুলে না। বালিশ, নরম খেলনা আর ঢিলেঢালা কম্বল ওর মুখের আশেপাশে থাকবে না, কারণ ওগুলো শ্বাসের পথ আটকে দিতে পারে।”

“তাহলে ঠান্ডা কীভাবে ঠেকাব?”

“কাপড় দিয়ে, মা। ঘুমের পোশাকটা একটু গরম রাখব, চাইলে ঘুমের জন্য বানানো বিশেষ থলের মতো পোশাকও আছে। হট ওয়াটার ব্যাগ বা ইলেকট্রিক কম্বল শিশুর বিছানায় একদমই নয়। আর রাতে ওর ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে মাঝে মাঝে দেখে নেব, ঘামছে কি না।”

নানু ধীরে ধীরে কাঁথাটা ভাঁজ করে সরিয়ে রাখলেন। “আমি ভাবতাম, যত বেশি মোড়াব ততই নিরাপদ।”

“অনেকেই তা-ই ভাবে,” নিরা বলল। “কিন্তু ঠান্ডা আর অতিরিক্ত গরম, দুটোই সমান ক্ষতিকর। মাঝামাঝিটাই আসল।”

বাবা-মায়েরও যত্ন দরকার

সপ্তাহ শেষে এক সন্ধ্যায় নানু নিরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোর ঠোঁট তো ফেটে গেছে রে। এত করে নাতনিকে দেখছিস, নিজের দিকে তাকাস না?”

নিরা আয়নায় নিজের ঠোঁটের দিকে তাকাল। সত্যিই, কোণার দিকে ছোট ছোট চিড়। গত কয়েকদিন ঘুম, দুশ্চিন্তা আর ঠান্ডায় নিজের কথা ভাবার সময়ই হয়নি।

সে মনে করল, ঠোঁট ফাটা নিয়ে লিপ বাম নাকি লিপ ক্রিম লেখাটাতে ঠিক এমন অবস্থার কথাই ছিল। কথাগুলো মনে রেখে সে একটা ভ্যাসলিন লিপ থেরাপি বের করে ঠোঁটে বুলিয়ে নিল। মেয়েকে চুমু খাওয়ার আগে সে এটুকু খেয়াল রাখে, যেন ঠোঁটের প্রসাধনী ভালো করে বসে যায়, আর ইফার মুখে সরাসরি না লাগে।

সাকিবের কনুই আর হাতের পিঠ শীতে সবসময়ই খসখসে হয়ে যায়। সে নিজের জন্য নিয়ে এল নিভিয়া কোল্ড ক্রিম। রাতে হাত-পায়ে মেখে মোজা পরে ঘুমাতে যাওয়া তার নতুন অভ্যাস। পুরো শরীরের জন্য নিরা বেছে নিয়েছে ভ্যাসলিন ইনটেনসিভ কেয়ার বডি লোশন। আর নানুর ফাটা গোড়ালির জন্য সাকিব এনে দিয়েছে নিভিয়া বডি লোশন। নানু প্রথমে “এসবের আবার কী দরকার” বললেও রাতে চুপচাপ পায়ে মেখে নিলেন।

একটা ছোট নিয়ম অবশ্য নিরা সবাইকে মনে করিয়ে দিল: নিজের ক্রিম বা লোশন লাগানোর পর হাত ধুয়ে বা ভালো করে মুছে তারপর ইফাকে ধরতে হবে। বড়দের ক্রিম শিশুর মুখে বা চোখে লাগলে ঝামেলা হতে পারে। আর ইফার ত্বকের জন্য যা, তা ইফার জন্যই আলাদা।

এক সপ্তাহ পরের সকাল

শনিবারের সকালে আবার কুয়াশা। কিন্তু ঘরের ভেতরটা আজ অন্যরকম উষ্ণ। রান্নাঘর থেকে ভাপা পিঠার গন্ধ আসছে। সাকিব ইফাকে কোলে নিয়ে জানালার ধারে বসেছে। ইফা খপ করে বাবার নাক ধরে খিলখিল করে হাসছে। নাক এখন পরিষ্কার, গালে সেই লালচে ভাব নেই, ত্বক মসৃণ।

নানু চায়ের কাপ হাতে পাশে এসে বসলেন। “জানিস নিরা, আমি তো ভেবেছিলাম এই কাঁথা আর তেল নিয়ে এসে তোদের শেখাব। এখন দেখছি, আমিই কত কিছু শিখে ফিরছি।”

নিরা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল। “আমরাও তোমার কাছ থেকে শিখেছি, মা। রোদে বসানোর অভ্যাস, ধৈর্য, আর সবচেয়ে বড় কথা, ভালোবেসে যত্ন নেওয়া। সেটা তো কোনো বইয়ে লেখা থাকে না।”

জানালার বাইরে কুয়াশা পাতলা হয়ে এল। ইফা মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। শীতের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে নিরা বুঝল, শিশুর শীতের যত্ন মানে বড় কিছু নয়। কয়েকটা ছোট ছোট অভ্যাস, একটু সচেতনতা, আর পরিবারের সবার এক হয়ে থাকা।

এক নজরে: শীতে শিশুর যত্ন

গল্প শেষ, কিন্তু নিরার সেই ফোনের নোটটা আপনার কাজে লাগতে পারে।

  • ঘর: আরামদায়ক উষ্ণ রাখুন, তবে বাতাস চলাচল বজায় রাখুন। হিটার, কয়লা বা কয়েলের ধোঁয়া শিশুর ঘরে নয়।
  • পোশাক: মোটা একটার বদলে পাতলা কয়েক স্তর। ভেতরে নরম সুতি। বুক বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে তাপমাত্রা বুঝুন।
  • গোসল: দিনের উষ্ণ সময়ে, কুসুম গরম পানিতে, পাঁচ-দশ মিনিটে। ঘষাঘষি নয়, চেপে চেপে মুছুন।
  • ত্বকের যত্ন: গোসলের পর ত্বক ভেজা থাকতেই শিশুর উপযোগী ক্রিম। নতুন কিছু লাগানোর আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নিন।
  • রোদ: সকালের নরম রোদে অল্প সময়। চোখে সরাসরি নয়।
  • খাবার: ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ। নতুন খাবার ডাক্তারের পরামর্শে, একবারে একটা। চিনি, লবণ আর এক বছরের আগে মধু নয়।
  • ঘুম: চিত করে, শক্ত বিছানায়। মুখের কাছে বালিশ, খেলনা বা ঢিলে কম্বল নয়।
  • সতর্ক সংকেত: দ্রুত শ্বাস, নীলচে ঠোঁট, জ্বর, দুধ না খাওয়া, অস্বাভাবিক ঝিমিয়ে থাকা, এর কোনোটা দেখলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান।
  • নিজের যত্ন: বাবা-মা সুস্থ থাকলেই শিশু ভালো থাকে। নিজের ঠোঁট, হাত আর পায়ের যত্নও নিন।

You might be interested in …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Chat Now