Cart
No products in the cart.


বাংলাদেশের নিষিদ্ধ চলচ্চিত্র বেশ কৌতুহল উদ্দীপক। নিষিদ্ধ শুনলেই মনে জেগে উঠে নানান প্রশ্ন-
সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এই পোস্টে। চাইলে এর আগে বা পরে বিশ্বের নিষিদ্ধ ১০টি চলচ্চিত্র সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন।
এক নজরে দেখে নিন যা আছে এই লেখায়-
আগের এক পোস্টে আমরা ১০ নিষিদ্ধ হিন্দি সিনেমা সম্পর্কে জানিয়েছিলাম। আজ জানাবো, বাংলাদেশের সিনেমা সম্পর্কে।
বাংলাদেশে কোনো সিনেমাকে “নিষিদ্ধ করা” মানে হল সেটির সেন্সর বোর্ড ছাড় পাওয়া থেকে বিরত থাকা বা সরকার/আদালত কর্তৃক প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা। নিচে ১০টি প্রধান চলচ্চিত্রের উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যেগুলো বিভিন্ন কারণে নিষিদ্ধ বা সেন্সর আটকে রয়েছে:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে “Remembrance of ’71” একটি উল্লেখযোগ্য নাম, কারণ এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধ–ভিত্তিক একটি ডকুমেন্টারি যা সেন্সর বোর্ড কর্তৃক প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি। যদিও এটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিচার ফিল্ম নয়, তবুও দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরার কারণে চলচ্চিত্রচর্চায় এর বিশেষ মূল্য রয়েছে।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড ১৯৯১ সালে ছবিটি নিষিদ্ধ করে। প্রধান কারণগুলো ছিল—
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা:
সে সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের বিষয়গুলো অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতার পালাবদল এবং যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক মূলধারায় প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ধরণের ডকুমেন্টারি রাজনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারত।
যুদ্ধাপরাধীদের নাম প্রকাশ:
চলচ্চিত্রটিতে পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সহযোগী রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর কর্মকাণ্ড সরাসরি তুলে ধরা হয়েছিল। এতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নাম প্রকাশিত হওয়ায় সেন্সর বোর্ড “জনঅসন্তোষ” ও “শান্তি ভঙ্গ” হওয়ার আশঙ্কা দেখায়।
অতিমাত্রায় গ্রাফিক চিত্রায়ন:
গণহত্যা, ধর্ষণ ও লাশের দৃশ্যগুলো খোলামেলা দেখানো হয়েছিল, যা সে সময় সেন্সর বোর্ড “অশ্লীল ও ভীতিপ্রদর্শক” আখ্যা দিয়ে সাধারণ দর্শকের জন্য অনুপযুক্ত বলে দাবি করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অজুহাত:
পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সময়কাল হওয়ায়, সরকার চাইছিল না নতুন করে এই ডকুমেন্টারি সেই সম্পর্ককে ক্ষুণ্ণ করুক।
পরিণতি ও উত্তরাধিকার
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ইতিহাসে “নদীর নাম মধুমতি” একটি বহুল আলোচিত সিনেমা। এটি নির্মাণ করেছিলেন বরেণ্য চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই ছবিটি দেশের ভেতরে মুক্তি পাওয়ার আগে সেন্সর বোর্ড কর্তৃক আটকে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ অবস্থায় ছিল।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
১৯৯৪ সালে সেন্সর বোর্ড ছবিটির প্রদর্শন অনুমতি দেয়নি। কারণগুলো ছিল—
“অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্টিক” অভিযোগ
সেন্সর বোর্ড দাবি করে, ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের চিত্রায়নে বাংলাদেশি জনগণের সংগ্রামী ইমেজকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করেনি; বরং যুদ্ধকালীন বিভ্রান্তি ও দুর্বলতাকে বেশি ফুটিয়ে তুলেছে। ফলে এটি “জাতীয় চেতনার বিরুদ্ধে” যায় বলে অভিযোগ করা হয়।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও যুদ্ধাপরাধীদের ইঙ্গিত
চলচ্চিত্রে স্থানীয় সহযোগী (রাজাকার/আলবদর) চরিত্র সরাসরি দেখানো হয়, যা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিতর্ক সৃষ্টি করে। কারণ ৯০ দশকে অনেক যুদ্ধাপরাধী আবার রাজনৈতিক মূলধারায় ফিরে এসেছিলেন।
গ্রাফিক ও বেদনাদায়ক দৃশ্য
নির্যাতন, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যগুলো সেন্সর বোর্ডের কাছে অতিমাত্রায় “ডিপ্রেসিং” এবং “ভীতিপ্রদ” মনে হয়েছিল। তারা যুক্তি দেয় যে, এসব সাধারণ দর্শকের জন্য মানসিক আঘাত সৃষ্টি করবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অজুহাত
চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছিল। সেন্সর বোর্ডের মতে, এই উপস্থাপন বাংলাদেশ-পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিণতি ও উত্তরাধিকার
বাংলাদেশি প্রামাণ্যচিত্র ইতিহাসে “মুক্তির গান” একটি অনন্য চলচ্চিত্র। এটি নির্মাণ করেছিলেন তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ। ছবিটি মূলত মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। যদিও এটি মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা তুলে ধরেছে, তবুও শুরুতে সেন্সর বোর্ড এটি নিয়ে আপত্তি তোলে এবং মুক্তির ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
নির্মাতা: তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
১৯৯৫ সালে ছবিটি মুক্তি দেওয়ার আগে সেন্সর বোর্ড আপত্তি তোলে। কারণগুলো ছিল—
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা
ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক বিভাজন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা দেখানো হয়। সেন্সর বোর্ড মনে করে এটি “জাতীয় ঐক্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে।”
বাস্তব ফুটেজের ভয়াবহতা
ডকুমেন্টারিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন শরণার্থী শিবির, গণহত্যার শিকার মানুষের কষ্টকর অবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব দৃশ্য ছিল। এগুলো সেন্সর বোর্ড “অতিরিক্ত বেদনাদায়ক” বলে উল্লেখ করে।
বিদেশি সম্পৃক্ততার কারণে শঙ্কা
ছবিটি আংশিকভাবে বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতার ফুটেজের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কিছু মহল থেকে অভিযোগ ওঠে যে, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে “বিদেশি দৃষ্টিকোণ থেকে” দেখাতে পারে।
কূটনৈতিক প্রভাবের অজুহাত
পাকিস্তানি সেনাদের নিষ্ঠুরতা ও পরাজয়ের চিত্র সরাসরি প্রদর্শিত হওয়ায় সেন্সর বোর্ড আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, এটি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিণতি ও উত্তরাধিকার
“Teardrops of Karnaphuli” (কার্ণফুলীর অশ্রু) একটি প্রামাণ্যচিত্র, যা নির্মাণ করেছিলেন চট্টগ্রামের আদিবাসী (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি) জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে। ২০০৫ সালে নির্মিত এ ডকুমেন্টারিটি মুক্তি পেতে গিয়ে বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ডে আটকে যায়।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড “Teardrops of Karnaphuli”–কে অনুমতি দেয়নি। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল:
জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির শঙ্কা
পার্বত্য চট্টগ্রাম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের সমালোচনা
আন্তর্জাতিক চাপের ভীতি
পরিণতি ও উত্তরাধিকার
“নমুনা” (Nomuna) ২০০৯ সালে নির্মিত একটি বাংলা চলচ্চিত্র, যা মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ডে আটকে যায় এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত নিষিদ্ধ সিনেমা হিসেবে পরিচিত হয়।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
“নমুনা” চলচ্চিত্রটি সেন্সর বোর্ড মুক্তি দেয়নি। এর প্রধান কারণগুলো ছিল:
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা
রাষ্ট্রবিরোধী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত
সরাসরি নেতিবাচক বার্তার আশঙ্কা
পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র “হৃদয় ভাঙা ঢেউ” (Hridoy Bhanga Dheu) ২০১১ সালে নির্মিত একটি সিনেমা, যা মুক্তির পূর্বেই সেন্সর বোর্ড কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত নিষিদ্ধ সিনেমার মধ্যে একটি।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড “হৃদয় ভাঙা ঢেউ” চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন অনুমোদন দেয়নি। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল:
অতিরিক্ত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য
নারী পাচার ও পতিতাবৃত্তি বিষয়ক কাহিনি
সমাজের প্রতি নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র “মর ঠেঙ্গারি” (Mor Thengari) ২০১৫ সালে নির্মিত হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত নিষিদ্ধ চলচ্চিত্রগুলোর একটি। সিনেমাটির নামের অর্থ “আমার ঠেঙ্গারি” বা “My Bicycle।” এটি মূলত বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড “Mor Thengari” সিনেমাটিকে প্রদর্শনের অনুমতি দেয়নি। এর কারণগুলো ছিল—
দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা
“অবাস্তব” হিসেবে গণ্য
পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধস (২০১৩) নিয়ে নির্মিত সিনেমা হলো “Rana Plaza”। এই চলচ্চিত্রটি ২০১৬ সালে মুক্তির চেষ্টা করা হলেও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সিনেমাটি শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিনেমাটিকে মুক্তির অনুপযুক্ত ঘোষণা করে এবং ২০১৬ সালেও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। তাদের প্রধান কারণগুলো ছিল—
জাতীয় ট্র্যাজেডি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা
মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা
“অতিরঞ্জিত দৃশ্য”
পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া
“Faraaz” (2023) হলো বাংলাদেশের এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের একটি বিতর্কিত সিনেমা। এটি নির্মিত হয়েছে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারি সন্ত্রাস হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যদিও সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত, বাংলাদেশে সেন্সর বোর্ড এটি প্রদর্শনের অনুমতি দেয়নি।
নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
সেন্সর বোর্ড চলচ্চিত্রটি মুক্তির অনুমতি না দেওয়ার পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে:
বাস্তব ঘটনার সংবেদনশীলতা
জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক উত্তেজনা
বাণিজ্যিক এবং নৈতিক বিতর্ক
আইনি জটিলতা
পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া
উপসংহার
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সেন্সরের বিষয়ে “নিষিদ্ধ সিনেমা”–র তালিকা নির্ধারণে সরকারি দিশানির্দেশ, সামাজিক/রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা, সাংস্কৃতিক প্রতীক ও জনগোষ্ঠীর মানসিক স্পর্শকাতরতা—all combined play গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা।

আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ অধ্যায়নরত। হৈচৈ বাংলা ওয়েবসাইটে মাঝে মধ্যে শখের বশে লিখি; যদিও টেকনোলোজি আমার পড়াশুনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তবু যে কোন বিষয়েই লিখতে ভাল লাগে।
