Cart
No products in the cart.


ওপেন হার্ট সার্জারি – শুনলেই হার্টবিট শুরু হয়ে যায়, তাই না! এটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানলে হার্টবিট বাড়বে না, বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
হার্ট, বা আমাদের হৃদপিণ্ড, শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। এটি রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় পুরো শরীরজুড়ে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে হার্টের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় চিকিৎসার জন্য হার্টে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, যাকে বলা হয় “ওপেন হার্ট সার্জারি”।
এই লেখায় আমরা জানব ওপেন হার্ট সার্জারি কী, কেন এটি করা হয়, কীভাবে করা হয়, ঝুঁকি ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য।
এক নজরে দেখে নিন যা আছে এই লেখায়-
ওপেন হার্ট সার্জারি (Open Heart Surgery) হলো এমন একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে চিকিৎসক বুকের হাড় (sternum) কেটে হৃদপিণ্ডে সরাসরি প্রবেশ করেন এবং হার্টের অভ্যন্তরীণ গঠন বা রক্তনালীতে (coronary arteries) কোনোরকম সার্জিকাল কাজ করেন।
এই অপারেশনে সাধারণত হার্ট-লাংস মেশিন ব্যবহার করা হয়, যা রক্ত সঞ্চালন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ সাময়িকভাবে চালিয়ে রাখে যখন হার্ট বন্ধ থাকে।
ওপেন হার্ট সার্জারির প্রচলিত আরেকটি নাম হলো “Traditional Heart Surgery“, বাংলা করলে হয় – “পরম্পরাগত হৃদযন্ত্র অস্ত্রোপচার”।
এছাড়া নির্দিষ্ট কাজের ভিত্তিতে আরও কিছু নামও ব্যবহার হয়, যেমন:
বিভিন্ন কারণে মানুষ “ওপেন হার্ট সার্জারির অন্যান্য নাম” জানতে চায়:
ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে হার্টের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ঠিক করা হয়, যা সাধারণ ওষুধ বা ছোট অস্ত্রোপচারে সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সার্জারির প্রয়োজন কেন পড়ে? চলুন জেনে নেই ওপেন হার্ট সার্জারির প্রধান কারণগুলো, এবং কোন পরিস্থিতিতে এটি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
হার্টের চারপাশে থাকা রক্তনালিগুলোতে (coronary arteries) চর্বি বা প্লাক জমে ব্লক তৈরি হলে, হার্ট ঠিকভাবে রক্ত পায় না। এতে হার্ট অ্যাটাক বা হৃদস্পন্দনজনিত সমস্যা হতে পারে।
সমাধান: এই অবস্থায় Coronary Artery Bypass Grafting (CABG) নামক ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়, যেখানে ব্লক হওয়া ধমনীর বিকল্প নতুন রক্তপথ তৈরি করা হয়।
হার্টে চারটি ভাল্ভ থাকে, যেগুলো রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। জন্মগতভাবে বা বয়সজনিত কারণে এই ভাল্ভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সমাধান: ভাল্ভ যদি ঠিকমতো খোলে বা বন্ধ না হয়, তাহলে ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে ভাল্ভ রিপেয়ার বা ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করা হয়।
অনেক শিশু জন্ম নেয় হার্টের গঠনে সমস্যা নিয়ে, যেমন — হোল ইন হার্ট, ভুলভাবে যুক্ত ধমনী, বা একটি চেম্বার অনুপস্থিত।
সমাধান: এই ধরনের জটিল ত্রুটি শুধুমাত্র ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমেই চিকিৎসা করা সম্ভব।
যখন হার্ট তার স্বাভাবিক কাজ একেবারেই করতে পারে না এবং জীবন হুমকির মুখে পড়ে, তখন একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় হার্ট প্রতিস্থাপন (Heart Transplantation)।
সমাধান: এটি একটি উন্নত মানের ওপেন হার্ট সার্জারি যেখানে একজন ডোনারের হার্ট প্রতিস্থাপন করা হয়।
হার্ট বা তার সংযুক্ত ধমনীতে কোনো অংশ দুর্বল হয়ে ফেঁপে গেলে তা অ্যানিউরিজম বলে। এটি ফেটে গেলে জীবনঘাতী হতে পারে।
সমাধান: এই বিপজ্জনক অবস্থায় ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে অ্যানিউরিজম অপসারণ বা প্রতিস্থাপন করা হয়।
হার্টের আবরণী (pericardium) বা ভাল্ভে সংক্রমণ (endocarditis) হলে তা চিকিৎসায় না সারলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
সমাধান: সংক্রমিত অংশ কেটে ফেলা বা প্রতিস্থাপন করাই একমাত্র উপায় হয়।
ওপেন হার্ট সার্জারি সাধারণত আগে থেকে পরিকল্পনা করে করা হয়। তবে কিছু জরুরি শারীরিক লক্ষণ ও অবস্থা আছে, যেখানে দ্রুত সার্জারি না করলে জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই ধরনের অবস্থাকে বলা হয় “emergency cardiac condition”।
আসুন জেনে নেই কোন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে হার্ট সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
যদি হঠাৎ বুকের মাঝখানে বা বাম দিকে তীব্র চাপ বা ব্যথা শুরু হয়, বিশেষ করে ব্যথা যদি কাঁধ, হাত বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
যদি ব্যথার উৎস হার্টের ধমনীতে ব্লক হয়ে থাকে, এবং অবস্থা গুরুতর হয়, তাহলে ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে বাইপাস (CABG) করতে হতে পারে।
এসব লক্ষণ হার্ট ফেইলিওরের দিকেই ইঙ্গিত করে, যেখানে হার্ট রক্ত পাম্প করতে পারছে না। এর ফলে ফুসফুসে পানি জমতে পারে।
এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে ওপেন হার্ট সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
এসব উপসর্গ যদি হয়, তবে বুঝতে হবে হার্টের বৈদ্যুতিক সংকেত ঠিকমতো কাজ করছে না। কখনো কখনো হার্টের নির্দিষ্ট অংশে সার্জারি করে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়।
হার্টে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে তা মস্তিষ্কেও রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে স্ট্রোক বা অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
যদি হার্টের কোন ভাল্ভ আচমকা ছিঁড়ে যায় বা অত্যধিক রক্ত লিক করতে থাকে, তখন তা দ্রুত ভাল্ভ প্রতিস্থাপন (valve replacement) করতে হয়।
হার্টের অভ্যন্তরে জীবাণু সংক্রমণ হলে তা হার্ট টিস্যু ধ্বংস করতে পারে।
হার্ট বা তার আশেপাশের ধমনী দুর্বল হয়ে গিয়ে ফুলে গেলে (aneurysm), সেটি যদি ফেটে যায় তাহলে তৎক্ষণাৎ সার্জারি না করলে মৃত্যু হতে পারে।
ওপেন হার্ট সার্জারি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ওপেন হার্ট সার্জারি হলো এমন এক জটিল অস্ত্রোপচার, যা হৃদযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন, ধমনী, ভাল্ভ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশে সোজা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে করা হয়। এই সার্জারির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে আপনি কোন ডাক্তার বা সার্জনকে নির্বাচন করছেন তার ওপর।
আসুন জেনে নেই কিভাবে আপনি একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য কার্ডিয়াক সার্জন নির্বাচন করতে পারেন।
ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য ডাক্তার বাছাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপসমূহ-
একজন ওপেন হার্ট সার্জনের মূল যোগ্যতা হওয়া উচিত:
এছাড়া, খেয়াল রাখুন:
সার্জন যদি কোনো বিশ্বস্ত বা স্বনামধন্য হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যেমন:
তবে ধরে নেওয়া যায় তিনি একটি মানসম্পন্ন ও প্রটোকলভিত্তিক পরিবেশে কাজ করেন।
বর্তমান যুগে আপনি সহজেই জানতে পারেন:
ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার সময় খেয়াল করুন:
একজন ভালো সার্জন সবসময় রোগীর এবং তার পরিবারের সঙ্গে পরিষ্কার ও সহানুভূতিশীলভাবে কথা বলেন।
শুধু সার্জন নয়, তার মেডিক্যাল টিম, নার্স, রিহ্যাব টিম কেমন তা-ও গুরুত্বপূর্ণ।
সার্জারির পরে:
সবচেয়ে নামী সার্জনের কাছেও চিকিৎসা নিতে গেলে বাজেট জানা জরুরি।
অনেক সময় সরকার অনুমোদিত কিছু হাসপাতালেও ভালো সার্জারি হয় তুলনামূলক কম খরচে।
সব দিক থেকে একজন সার্জন ভালো হলেও যদি আপনি তার প্রতি আত্মবিশ্বাসী না হন, তাহলে দ্বিতীয় মতামত (Second opinion) নিন।
ওপেন হার্ট সার্জারি আগে যথাযথ শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক প্রস্তুতি নেওয়া আবশ্যক। সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে সার্জারির ঝুঁকি কমে, সেরে ওঠার গতি বাড়ে এবং রোগীর আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
একটি সফল ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য প্রস্তুতি নিচের তিনটি বড় বিষয়ে সাহায্য করে:
ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুতি-
এসব রিপোর্ট দেখে সার্জনেরা নির্ধারণ করেন কী ধরনের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ওষুধ বন্ধ রাখতে হতে পারে, যেমন:
সার্জারির আগে অন্তত ২-৪ সপ্তাহ ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা জরুরি।
এগুলো:
ওপেন হার্ট সার্জারি শুনলেই অনেকেই ভয় পান, কিন্তু মনে রাখবেন:
সার্জারির আগের দিন বা সকালে ভর্তি হতে হতে পারে। সঙ্গে রাখবেন:
প্রিয়জনের ফোন নম্বর বা পরিচিত কেউ সঙ্গে রাখুন
চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখুন
ওপেন হার্ট সার্জারি বহু ধাপে ও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়। নিচে ধাপে ধাপে এই সার্জারির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হলো:
হৃদযন্ত্রের সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসক নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক কাজ করেন:
এই ধাপটি সবচেয়ে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ (৩–৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগতে পারে)।
যদিও আধুনিক চিকিৎসায় ওপেন হার্ট সার্জারির সাফল্যের হার অনেক বেড়েছে, তবুও এটি এখনো একটি বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন হিসেবে বিবেচিত।
জটিল অস্ত্রোপচার, সচেতনতা ও সাবধানতাই সাফল্যের চাবিকাঠি
আসুন জেনে নেই ওপেন হার্ট সার্জারির সম্ভাব্য ঝুঁকি, কারণ ও করণীয় সম্পর্কে।
হার্ট সার্জারিতে বুকের হাড় কাটা হয় এবং অনেক ধমনীতে কাজ করা হয়। এর ফলে:
যে কোনো সার্জারির মতো, ওপেন হার্ট সার্জারিতেও ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে:
ডায়াবেটিস, ধূমপান বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে।
অপারেশনের পর অনেক রোগীর শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে তরল জমা বা নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যারা:
তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি।
হার্ট-লাং মেশিন ব্যবহারের কারণে:
সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব সমস্যা কেটে যায়।
যদিও আজকাল ওপেন হার্ট সার্জারির সফলতার হার ৯০–৯৮% এর বেশি, তবে:
এই সার্জারির মৃত্যুঝুঁকি ২–৫% পর্যন্ত হতে পারে।
নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি:
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
সার্জারির আগে ও পরে কিছু সতর্কতা মেনে চললে এই ঝুঁকিগুলো অনেকটাই কমানো সম্ভব:
উপসংহার
ওপেন হার্ট সার্জারি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অসাধারণ সাফল্য। যদিও এটি একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার, তবে চিকিৎসক ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন এই সার্জারির সফলতার হার অনেক বেশি। যদি চিকিৎসক ওপেন হার্ট সার্জারির পরামর্শ দেন, তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই—সঠিক প্রস্তুতি ও পরিচর্যার মাধ্যমে একটি সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।

I am physician born serve for humanity, presently works at Dhaka Medical College and Hospital, previously worked at Kasba Upazila Health Complex and Austagram Upazila Health Complex.
